সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:২২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

বেড়েছে পারিবারিক সহিংসতা, প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন

নিজস্ব  প্রতিবেদক:  মহামারি করোনাভাইরাসের প্রতি ইঙ্গিত করে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড (জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা) কমিটির চেয়ারম্যান ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেছেন, সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থা ও সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে-কমে। দেড় বছর ধরে অতিমারির কারণে সামাজিক অস্থিরতা ও মানুষের দারিদ্র্য কিছুটা হলেও বেড়েছে। কর্মজীবীদের আয়-উপার্জন কমেছে। এসব কারণেই কিন্তু পারিবারিক সহিংসতাগুলোও বাড়ছে। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলনের, যে কাজটি বেসরকারি সংস্থাগুলো করতে পারে।

তিনি বলেন, ধর্ষণ ছাড়া অন্যান্য নির্যাতিত ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হয়। এ চিকিৎসার সাপোর্ট দেয় বিরাট লিগ্যাল এইড

শনিবার (১১ সেপ্টেম্বর) নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তাদের ভূমিকাবিষয়ক ভার্চুয়াল কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন কথা বলেন। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে এ অনুষ্ঠান হয়।

তিনি আরও বলেন, সরকারি লিগ্যাল এইড সেবার পরিধি আরও বৃদ্ধি করার চিন্তাভাবনা করতে হবে। যেমন- সমাজে স্বামী পরিত্যক্তা আছেন। ধর্ষণ ছাড়া অন্যান্য নির্যাতিত ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হয়। এখানে আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে মনে হয়। এ সাপোর্টগুলো না দেওয়ার কারণে দেখা যায়, অনেক সময় সাক্ষ্য নষ্ট হয়ে যায় ও ভিকটিম নানাভাবে বিভ্রান্তিতে পড়ে। সুতরাং এ বিষয়গুলো ধীরে ধীরে লিগ্যাল এইডে এনে পর্যায়ক্রমে পরিধি বাড়াতে হবে।

সরকারি আইনি সহায়তা বিষয়ে জনসচেতনতা ও প্রচারের ওপর জোর দিয়ে এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, পরিষেবা বাড়াতে হলে উপজেলা ও ইউনিয়ন লিগ্যাল এইড কমিটির কার্যক্রম আরেকটু গতিশীল করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের আইনি সহায়তায় প্যানেল আইনজীবীদের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা প্রয়োজন। কেননা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ডিল করা ও আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কার্যক্রম তুলে ধরেন সংস্থাটির পরিচালক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. সাইফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ৬৪টি জেলা লিগ্যাল এইড অফিস থেকে ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১ লাখ ২ হাজার ৬৬ জনকে আইনি পরামর্শ দিয়েছি। ২ লাখ ৯৪ হাজার ৬৮৭ জনকে মামলায় সহায়তা করা হয়েছে। ৪৯ হাজার ৯২৭ জনকে বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি সেবা দেওয়া হয়েছে। হটলাইনের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হয়েছে ১৭ হাজার ৩২৮টি। মোট ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৯৮ জনকে আইনি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা হিসেবে যারা কাজ করছেন, তারা মূলত বিচারিক কর্মকর্তা। নানাবিধ সীমাবদ্ধতার মধ্যে তারা উঠান বৈঠক, স্কুল ও কলেজে প্রচারণামূলক অনুষ্ঠান করছেন।

সভাপতির বক্তব্যে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ভালো যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। বারবার এটাই উঠে এসেছে যে, আইনি সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে কীভাবে প্রচার ও মানুষের সচেতনতা বাড়ানো যায়।

করোনাকালীন মানুষের জীবনে নানা সংকট আর্থিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত; তারপর সহিংসতা। সবাই এক কথা বলছি যে এই লিগ্যাল এইড সার্ভিস প্রান্তিক ও দুস্থ মানুষের জন্য বিশেষ করে দুস্থ ও পরিত্যক্তা নারীর জন্য অত্যন্ত জরুরি। এর পরিধি আরও কীভাবে বাড়াতে ও কার্যকর করতে পারি, সবাইকে তা নিয়ে চিন্তা ও কাজ করতে হবে।

নারীর ডিভোর্স দেওয়ার হার বৃদ্ধি প্রসঙ্গে শাহীন আনাম বলেন, একজন নারী যখন ডিভোর্স দেন, তখন অনেক অসহায় অবস্থায় দেন। তার আর কোনো উপায় থাকে না। কারণ, তিনিসহ সবাই জানি, সমাজে একজন ডিভোর্সড নারীর অবস্থান ও যে রকম কথা তাকে শুনতে হয়। অসহায় হয়ে যান। এ সত্ত্বেও যখন ডিভোর্স চান, তখন আমাদের খুব গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে, কেন ডিভোর্সের হার বাড়ছে? এখানে অনেক বিষয় আছে। সামাজিক মূল্যবোধের বিষয় আছে, সহিংসতা বাড়ছে। নানা রকম অবক্ষয় ও মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। এগুলো নিয়ে আলোচনা করা দরকার।

অনুষ্ঠানের শুরুতে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়কারী রুমা সুলতানা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয়, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মসূচির অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ। ২০২০ সালে কোভিড শুরু হওয়ার পর দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশে এই অবস্থা পর্যবেক্ষণে ফাউন্ডেশন নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা পর্যবেক্ষণ, প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য মুঠোফোনে জরিপ করে। ৫৩ জেলায় গত বছরের এপ্রিল থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৫ হাজার মানুষের মধ্যে এই জরিপ কার্যক্রম চলে। এই জরিপে দেখা যায়, ৪৮ হাজার ২৩৩ জন নারী ও শিশু পারিবারিক ও অন্যান্য ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ নারী ও ৬৭ শতাংশ শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে।

অনুষ্ঠানে রুমা সুলতানার সঞ্চালনায় ১৯টি জেলার জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা কর্মশালায় অংশ নেন। এতে আলোচনায় অংশ নেন- নেত্রকোনো জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা মো. মহিদুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা কুদরাত-ই-খোদা, কুমিল্লা জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ফারহানা লোকমান, বান্দরবান জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা আবুল মনসুর সিদ্দিকী, লক্ষীপুর জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফাহদ বিন আমিন চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ফারাহ মামুন ও ময়মনসিংহের জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা রওশন আরা রহমান প্রমুখ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমাদের অনুসরণ করুন

প্রযুক্তি সহায়তায় ইন্টেল ওয়েব