শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০৮:৩১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে দুর্বৃত্তদের হামলায় এক নার্স আহত ! মাগুরায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ, আহত ১০, বাড়ি ভাংচুর! উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের গ্রেফতার দাবীতে যুব মহিলা লীগের সমাবেশ! চরনারচর ইউনিয়নে সরকারী অনুদানের টাকা প্রদান করেন ইউপি চেয়ারম্যান রতন তালুকদার! সুনামগঞ্জে এক কৃষকের মাছ লুটের ঘটনায় দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবীতে মানববন্ধনে হামলা! নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ব্যবসায়ীকে চুরিকাঘাতে হত্যা-ঘাতক গ্রেফতার! দেশের ১৯টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা দাদু ভাই। শ্রীপুর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করেন! জন্মদিবসে ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে নিরব!

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যা : আদমজী জুট মিলে প্রকাশ্য প্রতিবাদ

কে এম নুরুল হুদা:

কে এম নুরুল হুদা: আজ থেকে ৪২ বছর আগের ঘটনা। সব কিছু মনে নেই; কিন্তু একটি দুঃসাহসী ঘটনা মনে আছে। আদমজী জুট মিলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তরুণ কবি কামাল চৌধুরী মঞ্চে কবিতা পাঠ করতে গিয়ে এক অসমসাহসিক কাজ করলেন; শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং তাঁকে নিয়ে কবিতা পাঠ করলেন। এ ঘটনা স্মরণ করে আমি আজও শিহরিত হই এবং এই প্রতিবাদের দিন আমি সেখানে ছিলাম, ভাবতে অন্য রকম স্মৃতি জাগে।

১৯৭৭ সালের ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে আদমজী জুট মিলের ১ নম্বর অফিসার্স কোয়ার্টারের অনুষ্ঠানে কী প্রবল সাহসিকতা দেখিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন তখনকার তরুণ কবি কামাল চৌধুরী।

আমি নিজে মুক্তিযোদ্ধা; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আমি পটুয়াখালীতে মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার ছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সে সময় কলকারখানা জাতীয় করা হয়। এসব কলকারখানা যাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ভালোভাবে চলে সে জন্য বঙ্গবন্ধু সিভিল সার্ভিসে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস নামে একটি সার্ভিস গঠন করেছিলেন। আমরা ১৯৭৩ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এই সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলাম। বিভিন্ন অফিস ও মিলে, আদমজী জুট মিলে আমরা মোট ছয়জন যোগদান করেছিলাম।

আমি তখন ২ নম্বর মিলের সহকারী ম্যানেজার। আদমজী জুট মিলে তখন চিফ লেবার অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার অফিসার ছিলেন প্রয়াত আহমদ হোসেন চৌধুরী। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একজন সোচ্চার কর্মকর্তা এবং বঙ্গবন্ধুর একজন ভক্ত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর অধীনে চাকরিতে যোগদান করেননি। দেশের অভ্যন্তরে থেকেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকার তাঁকে দুই বছরের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিও প্রদান করেছিল। আহমদ হোসেন চৌধুরী ছিলেন আমাদের সিনিয়র কর্মকর্তা। তাঁর বাসা ছিল ২৫ নম্বর অফিসার্স কোয়ার্টারে, আর আমার বাসা ছিল ৩ নম্বর অফিসার্স কোয়ার্টারে।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশে দুঃসহ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। তখন সামরিক শাসনের কারণে বঙ্গবন্ধুর নামও উচ্চারণ করা যেত না। সারা দেশের মানুষ আতঙ্কের মধ্যে বাস করছিল। এই পরিস্থিতিতেও স্বাভাবিক নিয়মেই আসে ১৯৭৭ সালের ২৬শে মার্চ। এই দিন উপলক্ষে অফিসার্স কোয়ার্টারে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আমি এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে ছিলাম।

তখন অফিসার্স কোয়ার্টারের পশ্চিম দিকে ছিল একটি বড় পানির ট্যাংক। আদমজী জুট মিল এখন ইপিজেডে রূপান্তরিত হয়েছে; কিন্তু পানির ট্যাংকটি এখনো আছে। তার পাশেই ছিল আহমদ হোসেন চৌধুরীর বাসা। তার সামনে পশ্চিম দিকে একটি খেলার মাঠ। আমরা সেখানেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম, সাধারণত অনুষ্ঠানাদি সেখানেই হতো। সেই অনুষ্ঠানে মঞ্চ সঞ্চালনার দায়িত্ব আমি পালন করি। সামনে বসার জন্য চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়। অনেকে সামনে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান দেখছিল।

আহমদ হোসেন চৌধুরীর মেজো ছেলে কামাল চৌধুরী তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তরুণ কবি হিসেবে তাঁর একটি পরিচিতিও তখন তৈরি হয়েছে। আমাদের এলাকায়ও দেয়াল পত্রিকা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে তাঁর ভূমিকা থাকত।

কামাল পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং মুখ্য সচিব হিসেবে সরকারের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করে এখন অবসরে। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কামাল সক্রিয় ছিলেন। ‘মুজিব লোকান্তরে, মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে’ স্লোগানটি তাঁরই লেখা। সেই অনুষ্ঠানে কামালকে আমরা কবিতা পাঠের জন্য আমন্ত্রণ জানাই। কামাল মঞ্চে উঠে এক প্রচণ্ড সাহসী ঘটনার অবতারণা করলেন। তিনি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা জানালেন এবং বললেন, ‘আজকে ২৬ মার্চ স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ না করে কোনো অনুষ্ঠান হতে পারে না।’ এ কথা বলে কামাল নিজের লেখা একটি কবিতা এবং নির্মলেন্দু গুণের একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন, যে কবিতা নির্মলেন্দু গুণ ১৯৭৭ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে পাঠ করে দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। ‘জয় বাংলা’ বলে কামাল কবিতা পাঠ শেষ করলেন।

কামালের বক্তব্য এবং কবিতা পাঠের সঙ্গে সঙ্গে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো। অনেকে ততক্ষণে আতঙ্কিত হয়ে অনুষ্ঠানস্থল থেকে চলে গেছে। কামাল এ অবস্থায় আবার মঞ্চে উঠে সবাইকে সাহস দিলেন এবং সবার উদ্দেশে বললেন, ‘আমি নিজ দায়িত্বে এই কবিতা পড়েছি, এতে কারো ভয়ের কোনো কারণ নেই।’ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ঢাকার বাইরে প্রকাশ্যে এভাবে কোনো প্রতিবাদ হয়েছে কি না আমার জানা নেই; সম্ভবত ঢাকার বাইরে এটিই প্রথম প্রতিবাদ। যে দুঃসাহসী ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন কামাল, তা এখন আমাদের প্রতিবাদের ইতিহাসের অংশ। এ জন্য তাঁর বাবাকেও পরবর্তীকালে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। আজ ৪১ বছর পরে যখন এই ঘটনা মনে করি তখন ভেবে অবাক হই যে কী করে কামাল এই দুঃসাহসী কাজ করতে পেরেছিলেন

লেখক : প্রধান নির্বাচন কমিশনার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমাদের অনুসরণ করুন

প্রযুক্তি সহায়তায় ইন্টেল ওয়েব